ঘুরে আসুন কুলাউড়ার কালাপাহাড়
বার্তালোক ডট কম
প্রকাশিত হয়েছে : ২৭ অক্টোবর ২০২২, ৬:১৫ মিনিট
কালাপাহাড় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের বেগুনছড়া পুঞ্জিতে অবস্থিত একটি পাহাড় যার উচ্চতা ১০৯৮ ফুট। এটি সিলেট বিভাগের সর্বোচ্চ পাহাড়চূঁড়া। এটা মূলত খাসিয়াদের গ্রাম। খাসিয়ারা গ্রামকে ‘পুঞ্জি’ বলে। পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় স্থান হচ্ছে এই কালাপাহাড়। আপনি যদি দুর্গম পাহাড়ি পথে ট্রেকিং করতে পছন্দ করেন, তবে কালাপাহাড় থেকে ঘুরে আসুন ছুটির দিনগুলোকে রোমাঞ্চকর করতে। কালাপাহাড় ঘুরে আরো জানাচ্ছেন মাহফুজ শাকিল…..
কালাপাহাড়ের প্রাণ ঃ নাগরিক কোলাহল থেকে মুক্ত, প্রকৃতির নির্জনতা, চারদিকে সবুজ গাছগাছালি, মাঝে মাঝে পাখ-পাখালির কিচির মিচির ডাক আর হিমেল শীতল বাতাস। পাহাড়ের চূঁড়ায় মেঘের দল যখন শরীর ছুঁয়ে যায় তখন এই রোমাঞ্চকর অনুভূতি আপনাকে দেবে এক পাহাড়সম প্রশান্তি। একসময় এই পাহাড়ে হরিনের দেখা মিলতো। এই পাহাড়ে যাবার ট্রেকিং পথটি অনেক সুন্দর। পাহাড়ে উঠার পথ একটা (পাহাড়ি পথ) কিন্তু নামার পথ দুইটি। ঝিরি পথ ও পাহাড়ি পথ। পাহাড় বেয়ে হেঁটে চলতে দেখতে পাবেন দুপাশে জঙ্গল। জঙ্গলের গাছ গুলতে চোখে পড়বে খাসিয়াদের লাগানো পান গাছ ও সুপারি গাছ। কালাপাহাড়ের চূঁড়া থেকে নিচে তাকালে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজের সমারোহ। নিচের ছোট ছোট পাহাড় গুলো মনে হবে গালিচার মত। এ এক অপরূপ সৌন্দর্যের দৃশ্য। চারপাশে সবুজের অবারিত সৌন্দর্য আর দিগন্ত-জোড়া আকাশের নীলে মনে হবে রাজ্যের সকল নিসর্গ যেনো এখানেই এসে খুঁটি গেড়েছে। কালা পাহাড়ের একদম শীর্ষস্থান যেখানে ট্যুরিস্টরা কলম দিয়ে কাগজে আরোহীদের নাম সহ স্মৃতিচারণ নোট লিখে তা বোতলবন্দী করে গাছে ঝুলিয়ে রাখে। সেই বিখ্যাত সামিট পয়েন্টে গিয়ে আসল পাহাড় জয় করতে হয়। তখন আশেপাশের দৃশ্য দেখে এক নিমিষেই পিছনের সব কষ্ট ভূলে যেতে পারবেন।
কালাপাহাড়ের প্রকৃতি : কালাপাহাড় সিলেট বিভাগের সর্বোচ্চ পাহাড়চূঁড়া। ২০১৫ সালে একদল ভ্রমণপিয়াসী অভিযাত্রী ‘বিডি এক্সপ্লোরার’ সর্বপ্রথম এই অনিন্দ্য সুন্দর চূড়াটি খোঁজে পায় এবং গারমিন চালিত জিপিএস দিয়ে এর সর্বোচ্চ বিন্দু সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় ১ হাজার ৯৮ ফুট পরিমাপ করে। কালাপাহাড়কে স্থানীয় ভাষায় লংলা পাহাড় নামে ডাকা হয়। কালাপাহাড়ের সর্বোচ্চ বিন্দু থেকে হাকালুকি হাওরের সৌন্দর্য ও নীল পানি দেখা যায়। কুলাউড়া শহর থেকে কালাপাহাড়ের দূরত্ব আনুমানিক ৩৫ কিলোমিটার। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এখানে আসেন এক্সট্রিম অ্যাডভেঞ্চার্স ট্রেকিং ট্রেইলের ট্রিপ দেওয়ার জন্য।
প্রাকৃতিক আকর্ষণ ও আনন্দ : শরৎকালে আকাশ পরিষ্কার হলে, কালা পাহাড়ের সর্বোচ্চ বিন্দু থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকির নীল পানি স্বচ্ছভাবে অবলোকন করা যায়। বর্ষাকালে পাহাড়টির চূড়া থেকে আকাশে মেঘের খেলা একদম কাছাকাছি উপভোগ করা যায়। বৃষ্টির দিনে যাত্রাকালে ঝিরিপথ দিয়ে হাটার সময় বেশ কয়েকটি ছোট ঝর্ণা পাওয়া যায়। পাহাড়ি মেঠোপথ দিয়ে হাটার সময় গাছ গাছে লাফিয়ে বানরের দলগুলো অতিথিদের মনোরঞ্জন দিয়ে স্বাগতম জানায় খাবার ছুঁড়ে দেওয়ার জন্য। পাহাড়ি ছোট ছোট খালের উপর গাছের গুড়ির সাঁকো পার হওয়া খুবই আনন্দদায়ক। গাছে গাছে বানরের লাফানো শীতকালে পাহাড়টি আরও সুন্দরভাবে ফুটে উঠে। কালা পাহাড় একেক ঋতুতে আরেক ভিন্নরূপ ধারণ করে। ঘন বনে উঁচু গাছের আড়ালে যখন সূর্য চোখে দেখতে পারবেন না তখন মনে হবে ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গলে আছেন।
স্থানীয় সংস্কৃতি : এই পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী খাসিয়া জাতিগোষ্ঠীর মানুষ প্রায় সবাই খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। এই পাহাড় সংলগ্ন কিছু গ্রাম রয়েছে। যেমন:- সীমান্তবর্তী বেগুনছড়া, পুঁটিছড়া, লবণছড়া পুঞ্জি। এই পুঞ্জিগুলোতে প্রায় পাঁচশ পরিবারের বসবাস। আশপাশে আরো বেশ কয়েকটি খাসিয়া গ্রাম রয়েছে। এখানকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস পান চাষ।
কালাপাহাড়ের অবস্থান : এই পাহাড়টির এক পাশে বাংলাদেশের কুলাউড়া উপজেলা, অন্যপাশে জুড়ী উপজেলা ও ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত। বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক সোসাইটির মতে, কালাপাহাড়টি ‘লংলা হাড়ারগঞ্জ পাহাড়’ নামেও পরিচিত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় অবস্থান করা এই পাহাড়ের ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে পড়েছে এবং বাকি অংশ ভারতের উত্তর ত্রিপুরায় অবস্থিত। ত্রিপুরায় এই পাহাড়টির বাকি অংশ রঘুনন্দন পাহাড় নামে পরিচিত। ভারতের বিখ্যাত প্রাচীন প্রতœতাত্ত্বিক লল ধর্মীয় স্থান ঊনকোটি এই পাহাড়টির পাদদেশে অবস্থিত।
যেভাবে যাবেন : কালাপাহাড় যেতে হলে দেশের যেকোন প্রান্ত থেকে ট্রেন অথবা বাসে করে প্রথমে কুলাউড়ায় আসতে হবে। কুলাউড়া থেকে সিএনজি যোগে পৃথিমপাশার রবিরবাজার হয়ে কর্মধার আজগরাবাদ চা বাগান গেইটে সকাল ৮টার আগে পৌঁছাতে হবে। তারপর এখানে গাড়ি রেখে বাগানের রাস্তা দিয়ে ৪৫ মিনিট পায়ে হেঁটে বেগুনছড়া পুঞ্জিতে যেতে হবে। এরপর বেগুনছড়া পুঞ্জির দায়িত্বশীল মন্ত্রী (হেডম্যান) কাছ থেকে স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইড নিয়ে টানা ২ ঘন্টা পাহাড় আরোহণ করা লাগবে। গাইড রেডি রাখার ব্যাপারে ভ্রমণের আগেরদিন বেগুনছড়া পুঞ্জির দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী লেম্বুর সাথে টেলিফোনে (০১৯৫১৬৪৯৮৮১) যোগাযোগ করলে ভাল হয়।
স্থানীয় কর্মধা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুহিবুল ইসলাম আজাদ বলেন, পর্যটকদের জন্য দৃষ্টিনন্দন স্থান হিসেবে খ্যাত কালাপাহাড়কে পর্যটন শিল্পের আওতায় আনলে সরকারের অনেক রাজস্ব বাড়বে বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপক (বিক্রয় উন্নয়ন ও জনসংযোগ) মো. জিয়াউল হক হাওলাদার বলেন, কালাপাহাড় নিয়ে আমাদের উদ্যোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা সিলেট বিভাগের সমস্ত পর্যটন আকর্ষণীয় স্থানগুলো খুঁজে বের করেছি। সেই তালিকায় কালাপাহাড় রয়েছে। সেটি পর্যটন কর্পোরেশনের ওয়েবসাইটেও দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে কালাপাহাড় সহ সকল পর্যটনস্থানে পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় সকল কাজ করা হবে।
এ বিষয়ে কথা হয় মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসানের সাথে। তিনি জানালেন, যতটুকু জেনেছি কালাপাহাড় সিলেটের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। এই পাহাড়ে যেতে হলে বন জঙ্গল ও অনেক পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে যেতে হয় যা পর্যটকদের জন্য অনেকটা কষ্টসাধ্য। এ জন্য পর্যটকদের সেখানে যাওয়ার সুবিধার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কালাপাহাড়কে পর্যটন শিল্পের আওতায় আনার জন্য পরিকল্পনা করে একটি প্রস্তাবনা বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনে পাঠানো হয়েছে




