সুন্দরবনে বাঘ বেড়েছে, ধারণা বনবিভাগের
বার্তালোক ডট কম
প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ৭:১২ মিনিট
মহিদুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট) : সুন্দরবনে বৃদ্ধি পেয়ে বাঘের সংখ্যা। এমনটাই ধারণা করছে বনবিভাগের। বাস্তবিক অর্থে এর প্রমাণও মিলছে। গত দুই বছর ধরে সুন্দরবনের পর্যটক, বনজীবী ও বনরক্ষীদের কাছ থেকে প্রায়ই বাঘ দেখতে পাওয়ার খবর আসছে। তাতে প্রমাণিত হয় যে, বাঘের সংখ্যা তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৮২ সালে প্রথম পায়ের ছাপ পদ্ধতিতে (পাগমার্ক) বাঘ শুমারি করে সুন্দরবনে বাঘ পাওয়া যায় ৪৫৩টি। এর পর ২০০৪ সালে একই পদ্ধতির গণনায় পাওয়া যায় ৪৪০টি। এ পর ক্যামেরা পদ্ধতিতে (ক্যামেরা ট্যাপিং) ২০১৫ সালের গণনায় পাওয়া যায় মাত্র ১০৬টি এবং ২০১৮সালের সর্বশেষ জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১১৪টি।
বাঘের সংখ্যা হতাশাজনক হারে কমতে থাকায় ২০২২ সালের ২৩ মার্চ বাঘের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ ও বাঘ সংরক্ষণের জন্য পরিবশে, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ‘সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প’ অনুমোদন দেয়।
তথ্যানসন্ধানে জানা যায়, এক সময় গোটা সুন্দরবন ছিল বনদস্যু ও জলদস্যুদের দখলে। জেলে ও বনজীবীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করতো তারা। এ ছাড়া বাঘ-হরিণ ও কুমির শিকার করে তার চামড়া, মাংস ও হাঁড়গোড় পাচার করাও ছিল দস্যুদের অন্যতম একটি লাভজনক পেশা। দস্যুদের সঙ্গে যোগসাজসে বনসন্নিহিত এলাকাতেও গড়ে উঠেছিল বন্যপ্রাণী শিকারের বিশাল নেটওয়ার্ক।
২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবন দস্যুমুক্ত ঘোষণার পর থেকে কমে এসেছে বাঘ ও বন্যপ্রাণী হত্যা। একসময় লোকালয় থেকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হতো বাঘ-হরিণের চামড়া-মাংস, কঙ্কাল। কিন্তু এখনও মাঝে মধ্যে হরিণের মাংস-চামড়া উদ্ধারের খবর শোনা যায়। তবে, গত দুই বছরে বাঘ হত্যা বা তার চামড়া-কঙ্কাল উদ্ধারের খবর নেই বললেই চলে। যার ফলশ্রুতিতে এখন বনে ঢুকলেই প্রায়ই মিলছে বাঘের দেখা।
সর্বশেষ গত শুক্র-শনি ও রবিবার (১-২ ও ৩ সেপ্টম্বর) পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলার রেঞ্জের কটকা টাওয়ারের খাল ও কচিখালী নদী সাঁতরে পার হওয়া এবং শরণখোলা রেঞ্জ অফিস ও আলীবান্দা ইকো-ট্যুরিজস কেন্দ্রের মধ্যবর্তী বনসহ পৃথক তিন স্থানে তিনটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখতে পান পর্যটক ও বনরক্ষীরা। এ নিয়ে চলতি বছরে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের বিভিন্ন স্থানে চতুর্থবারের মতো মিলেছে বাঘের দেখা।
এর আগে গত ৮ আগস্ট সকালে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য কেন্দ্রের অফিসের সামনে একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখতে পান বনরক্ষীরা। বিশাল রয়েল বেঙ্গল টাইগারটি বনরক্ষীদের ব্যারাকের খুব কাছে চলে আসে। এ সময় মোবাইলে বাঘটির ভিডিও ধারণ করেন এক বনরক্ষী।
এ ছাড়া গত ৩ ফেব্রুয়ারি দুপুরে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের চান্দেশ্বর টহল ফাঁড়ি অফিসের পুকুর পাড়ে দেখা মেলে জোড়া বাঘের। একদিন-একরাত (প্রায় ২২ ঘণ্টা) সেখানে অবস্থান করে বাঘ দুটি আবার বনে ফিরে যায়। গত বছরের (২০২২সাল) ৩১ অক্টোবর পশ্চিম বনবিভাগের সজনেখালী রেঞ্জ অফিসের চোরাগাজীখালীর বনে চারটি বাঘ দেখতে পান পর্যটকরা। একই বছরের ১২ মার্চ শরণখোলা রেঞ্জের ছিটা কটকা এলাকায় চারটি বাঘের দেখা পান পর্যটকরা। ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি কটকা এলাকায় বনরক্ষীরা দেখতে পান তিনটি বাঘ।
বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে শুরু হয় বাঘ শুমারি। এপ্রিলে শেষ হয়েছে ওই দুই রেঞ্জের ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনার কাজ। ঝড়-বৃষ্টি মৌসুমের কারণে ৬ মাস বিরতির পর এবছরের ১ নভেম্বর থেকে পূর্ব সন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে বাঘ শুমারির কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে চাঁদাপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের খাল জরিপের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় পরিচালিত সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের খাল জরিপে অংশগ্রহণকারী ওয়াইল্ড টিমের শরণখোলা ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর মো. আলম হাওলাদার জানান, ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই মাস বাঘ শুমারির জন্য তারা ৮জন সদস্য শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের সকল খাল জরিপ করেছেন। এ সময় তারা চাঁদপাই রেঞ্জের শেখের ট্যাক, চরাপুটিয়া ও শরণখোলা রেঞ্জের কোকিলমনি এলাকায় চারটি বাঘ দেখতে পেয়েছেন।
আলম হাওলাদার জানান, বাঘের প্রধান শত্রু ছিল বনদস্যু। সেই বনদস্যুরা এখন আর নেই। সেই সাথে হরিণ শিকারীদের তৎপরতাও কমেছে। এ কারণে পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে বাঘ। ফলে, অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করায় আগের তুলনায় বাঘ বৃদ্ধি পেয়েছে সুন্দরবনে।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন কর্মকর্তা (এসিএফ) শেখ মাহবুব হাসান বলেন, বন বিভাগের কঠোর নজরদারিতে বন অপরাধ কমে যাওয়ায় বাঘ, হরিণের সংখ্যা বেড়েছে। ভবিষ্যতে পর্যটকরা সুন্দরবনে অহরহ বাঘের দেখা পাবেন বলে আশা করি।
এসিএফ মাহবুব হাসান আরো বলেন, তিন মাস বন্ধ থাকায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। কোলাহলমুক্ত থাকায় বাঘসহ বন্যপ্রাণীরা নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ পেয়েছে। যার প্রমাণ হিসেবে প্রথমবার বনে প্রবেশ করেই বাঘের দেখা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প পরিচালক ও পশ্চিম বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ডক্টর আবু নাসের মোহসিন হোসেনের কাছে সোমবার (৪ সেপ্টম্বর) বিকেলে মুঠোফোনে জানতে চাইলে কালের কণ্ঠকে বলেন, পশ্চিম বনবিভাগে খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে বাঘ শুমারির কাজ শেষ হয়েছে। ১ নভেম্বর থেকে শুরু হবে পূর্ব বনবিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে। দুই বিভাগের জরিপ কার্যক্রম পর্যালোচনা করে ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবসে এর ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প পরিচালক ড. আবু নাসের বলেন, ধারণা করা হচ্ছে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ হচ্ছে, সুন্দরবন এখন দস্যুমুক্ত। বাঘ হত্যাকারীদের অন্যতম ছিল বনদস্যুরা। সেই বনদস্যু না থাকা এবং বনবিভাগের কঠোর নজরদারিতে বাঘ-হরিণ হত্যা ও শিকার অনেকাংশে কমেছে।
ড. আবু নাসের আরো বলেন, এ বছরের জরিপে সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা পাওয়া গেছে ১ লাখ ৪২ হাজার। বাঘের অন্যমত খাবার হরিণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া ২০২০ সালের আগে সুন্দরবনের মোট আয়তনের ২৩ ভাগ ছিল অবয়ারণ্য। বর্তমানে সেখানে অভয়ারণ্য করা হয়েছে ৫২ শতাংশ। বনের অর্ধেক অংশেই মানুষ অহরহ প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে বাঘ ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ-প্রজনন অবাধ ও নিবিঘ্নে হওয়ায় বাঘের সংখ্যা বাড়ার আরেকটি অন্যতম কারণ বলে মনে করি। তবে, জরিপের ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত সঠিক কিছু বলা যাচে না।




