কুলাউড়ায় মামলা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা! বাদীকে চিনেন না অনেক আসামী
বার্তালোক ডট কম
প্রকাশিত হয়েছে : ৩১ আগস্ট ২০২৪, ৪:০২ মিনিট
বিশেষ প্রতিনিধি : বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ও গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়ার পর দেশব্যাপী আওয়ামীলীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আসামী করে মামলা দায়ের হয়েছে। আর এসব মামলার বাদী আন্দোলনে নিহতের পরিবার কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি। কিন্তু কুলাউড়ায় সম্প্রতি ৮৩ জনের নামোল্লেখ করে একটি মামলা দায়েরের পর মামলার বাদী ও আসামীদের নাম নিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী সমর্থিত ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৮৩ জন নেতাকর্মীর নামে বিস্ফোরক আইনে গত ২৪ আগস্ট পারভেজ মিয়া নামের এক ব্যক্তি মামলা করেন। অজ্ঞাত আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে আসামি করা হয়। বাদী পারভেজ উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের কুদ্দুস মিয়া ওরফে কালা মিয়ার ছেলে।
মামলায় উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম রেনুকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম সফি আহমদ সলমান, সহ সভাপতি শফিউল আলম সফি ও অরবিন্দু ঘোষ বিন্দু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সদ্য সাবেক পৌর মেয়র সিপার উদ্দিন আহমদ, সাংগঠনিক সম্পাদক বদরুল ইসলাম বদর, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক ফজলু, কাদিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাফর আহমদ গিলমান, ভাটেরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মমদুদ হোসেন, হাজীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওয়াদুদ বক্স, কুলাউড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোছাদ্দিক আহমদ নোমান ও কর্মধা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুহিবুল ইসলাম আজাদসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। মামলায় অনেকের নাম থাকলেও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আসম কামরুল ইসলামের নাম নেই মামলায়।
পারভেজ মিয়া এজাহারে উল্লেখ করেন, গত ১৮ জুলাই সকাল ১১টার পর কুলাউড়া পৌর শহরে সাধারণ শিক্ষার্থীরা একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল বের করে। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে সংহতি জানিয়ে স্লোগান দিলে মামলার প্রধান আসামিসহ অন্যান্যদের নির্দেশে শহরের মিলিপ্লাজার সামনে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ককটেল সাদৃশ্য বস্তু নিক্ষেপ করে শিক্ষার্থীসহ তাকে মারধর করে। এতে তিনিসহ অনেকেই আহত হন।
এদিকে বিএনপির একাধিক নেতা মামলার বাদী ও স্বাক্ষীদের সাথে তাদের দলের সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন। উল্টো বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী এমন মামলা নিয়ে নিজেরাও প্রশ্ন তুলছেন। পারভেজ মিয়া নিজে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে থাকার কথা মামলায় উল্লেখ করেন। কিন্তু কুলাউড়ার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বে থাকা একাধিক স্বমন্বয়কও মামলা এবং মামলার বাদী তাদের সাথে সম্পৃক্ততা নেই বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন। এই ব্যাপারে কুলাউড়া স্টুডেন্ট মুভমেন্ট এর স্বমন্বয়করা বলেন তারা এই সকল মামলার বিষয়ে কিছুই জানেন না এমনকি বাদীকে তারা চিনেনও না।
দেশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় কুলাউড়ায়ও আওয়ামী লীগ ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্রদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। তবে এতে নিহতের কোন ঘটনা ঘটেনি। সরকার পতনের দুই সপ্তাহ পর মামলার বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহলসহ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্ররাও বিস্ময় প্রকাশ করেন। একাধিক সূত্রের মতে এ মামলার পেছনে গত ইউপি নির্বাচনে পরাজিত এক চেয়ারম্যান প্রার্থী এবং স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক ব্যক্তির ইন্ধন রয়েছে বলে গুঞ্জন উঠেছে ।
সচেতন মহলের দাবি, ছাত্র জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন। আন্দোলন চলাকালে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রদের মিছিলে হামলা করেন। তবে সরকার পতনের পর থেকে কুলাউড়ায় ভাঙচুর হলেও কেউ নিহত হয়নি। এরকম মামলা উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন থাকতে পারে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কিছু পোস্টে ব্যাপক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এরকম স্বার্থান্বেষী মহলের উদ্দেশ্য প্রণোদিত মামলায় যাতে কুলাউড়ার সম্প্রীতি বিনষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে দাবি সচেতন মহলের।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কুলাউড়ার স্বমন্বয়ক আতিকুর রহমান তারেক বলেন, পারভেজের মামলার সাথে আমাদের ছাত্র আন্দালনের কোন সম্পৃক্ততা নেই। তাকে মামলার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সে আমাদের জানায়, পারিবারিক ঘটনায় সে থানায় অভিযোগ দিয়েছিল কিন্তু ৮৩ জনের মামলার বিষয়ে সে কিছুই জানে না।
আরেক সমন্বয়ক মইনুল ইসলাম বলেন, মামলার বিষয়ে আমরা কিছুই জানিনা এমনকি বাদীকেও আমরা চিনিনা। মামলার বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে তাকে ফোন দিলে সে জানায়, তাকে দিয়ে এই মামলা করানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে মামলার বাদী পারভেজ মিয়ার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে ফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মামলার বিষয়ে ভাটেরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ একেএম নজরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ আট বছর থেকে আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কোনটাসা ছিলাম। ২০২১ সালের নির্বাচনে আমাকে দলীয় মনোনয়ন না দিয়ে বহিষ্কার করা হয়েছিল। গত ৮ বছর থেকে আমি আমার ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব আর আমার ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যতীত রাজনৈতিক কোন কর্মকান্ডে বিন্দুমাত্র জড়িত ছিলাম না। আমার উপরে মামলা হয়েছে শুনে আমি মামলার বাদীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম মামলার বাদী বলেছে, সে আমাকে চিনে না আমার নাম মামলায় সে অন্তর্ভুক্ত করে নাই কিভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সে বলতে পারবেনা। একইভাবে বাকি ইউপি চেয়ারম্যানরাও জানান, তারা চলমান পরিস্থিতিতে কোন মিছিলে সম্পৃক্ত না থাকলেও তাদের এই মামলায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে হয়রানি করার জন্য আসামী করা হয়েছে। সুষ্টু তদন্তের মাধ্যমে এই মামলা থেকে তাদের অব্যাহতির দাবি জানান।
কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিনয় ভূষণ রায় মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, পারভেজ মিয়া নামের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে ৮৩ জন নেতা-কর্মী ও ইউপি চেয়ারম্যানদের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন। আসামীরা পলাতক রয়েছে। এছাড়া বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এডভোকেট আবেদ রাজা বলেন, মামলা প্রক্রিয়ার সাথে আমি কিংবা উপজেলা বিএনপির কেউই সম্পৃক্ত নই। আমি জানিনা, কে বা কারা কিসের জন্য এই মামলা করেছে। মামলার বাদী পারভেজ বিএনপির সাথে যুক্ত রয়েছেন বলে আমার জানা নেই।




