মাহফুজ শাকিল/ মো: ইব্রাহিম আলী :মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নে বুধবার মধ্যরাতে মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ মিয়ারপাড়া বাঁধসহ দু’টি স্থানে প্রায় ছয়শত ফুট এলাকা জুড়ে বিশাল ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ৭২ ঘন্টার টানা ভারি বর্ষণে এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে এই ভাঙনের সৃষ্টি হয়। এর আগে মঙ্গলবার মধ্যরাতে ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামে প্রায় ছয়শত ফুট এলাকা জুড়ে বিশাল ভাঙ্গন দেখা দেয়। পাউবো জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টার তথ্যানুযায়ী মনু নদীর পানি হাজীপুর ইউনিয়নে রেলব্রিজ এলাকায় বিপদসীমার ১০৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সরেজমিন বৃহস্পতিবার ভোর সাতটায় টিলাগাঁও ইউনিয়নের মিয়ারপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৬০০ ফুট বিশাল জায়গা জুড়ে আলোচিত ঝুঁকিপূর্ন নদী প্রতিরক্ষাবাঁধটি বুধবার মধ্যরাতে ভেঙে যায়। গত দুইদিন ওই বাঁধটি রক্ষায় স্থানীয় ৪ শতাধিক লোকজন বালুর বস্তা ফেলে প্রাণপণ চেষ্টা চালালেও শেষমেশ রক্ষা করা যায়নি বাঁধটি৷ বাঁধটি ভেঙে গেলে আশপাশের ১০-১২টি এলাকায় পানি প্রবেশ করে। বিশেষ করে ইউনিয়নের মিয়ারপারাসহ অনেক গ্রাম এখন পানির নিচে। ওইসব এলাকার অনেক লোকজন নিরাপদ স্থানে যেতে পারেননি। নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য লোকজন ছুটাছুটি করছেন। তাদের উদ্ধারে কুলাউড়ার কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা ভাঙ্গনকৃত স্থানে রয়েছেন। মানুষের ঘরের আসবাবপত্র, গরু, ছাগল দুই দুইদিন ধরে নদীর বাঁধের উপরে রাখা হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের মাঝে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। মনু নদের এই ভয়াবহ ভাঙ্গনে তাদের ঘরবাড়ি পানির সাথে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
এদিকে টিলাগাঁও ইউনিয়নের আশ্রয়গ্রাম, লালবাগ, সন্দ্রাবাজ ও খন্দকারের গ্রাম, পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া, ছৈদলবাজার, বেলেরতল এবং হাজিপুর ইউনিয়নের মন্দিরা, দাউদপুর, চক রনচাপ ও কাউকাপন বাজার এলাকায় মনু নদীর পানি প্রতিরক্ষা বাঁধ ঝুকিপূঁর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব স্থানে যেকোন সময় ভাঙন সৃষ্টি হতে পারে। গত তিনদিন থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় লোকজনের উদ্যোগে বালির বস্তা দিয়ে ভাঙন ঠেকাতে প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হয়।
হাজিপুর ও মিয়ারপাড়া গ্রামে মনু নদীতে সৃষ্ট ভাঙন এলাকা পরির্দশনে গেলে ইউনিয়নের সাত নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জুনাব আলী জানান, বুধবার রাত ১২ টা ৫০ মিনিটে ঝুঁকিপূর্ণ মিয়ারপাড়া বাঁধটি মনু নদীর পানির স্রোতে ভেঙে যায়। এতে আমার ওয়ার্ড পুরোটাই প্লাবিত হয়। অনেক ঘরবাড়ি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক লোকজন রাতে নিরাপদে অন্যত্র আশ্রয় নেন, কিছু লোক নদীর বাঁধের উপর রয়েছেন আবার কিছু লোক ঘরের ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের উদ্ধার করার জন্য নৌকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের এলাকায় কোন নৌকা নেই। তারপরও মানুষদের উদ্ধারে মিয়ারপাড়ায় যাচ্ছি৷ ভাঙ্গনের কারণে ইউনিয়নের তাজপুর,গন্ডারগ্রাম, খন্দকার গ্রাম, কামালপুর, লহরাজপুর, ছালামতপুর, কাজিরগাঁওয়ে পানি অঝোর ধারায় প্রবেশ করছে। এতে ইউনিয়নের ১৫-২০টি গ্রাম প্লাবিত হবে৷ ভাঙ্গনের কারণে টিলাগাও ইউনিয়ন ছাড়াও উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার, রাউৎগাঁওসহ আরো কয়েকটি ইউনিয়ন প্লাবিত হবে। এরআগে মঙ্গলবার বিকাল থেকে মনু নদীর পানি গুদামঘাট (হাজিপুর) এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধের উপর দিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছিলো। সৃষ্ট ভাঙনের ফলে টিলাগাঁও ইউনিয়নের সাত নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ৭ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি রয়েছেন। এছাড়া ৪ শতাধিক ঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
মিয়ারপাড়া গ্রামের আসুক মিয়া জানান, বাঁধের নিচে আমার পাকার ঘর ছিল। নদীর ভাঙ্গনে আমার ঘরটি পানির স্রোতে পুরোটা ভেঙে যায়। ঘরের কোন জিনিসপত্র বের করতে পারিনি। ৯ সদস্যদের সংসারে কিছু সদস্য আমার আত্মীয়য়ের বাড়িতে আর কিছু সদস্য বাঁধের উপরে আশ্রয় নিয়েছেন। মহান আল্লাহ পাক আমাদের রক্ষা করুন। আমি ছাড়াও আরো ১০-১২ জনের ঘর ভেঙে গেছে।
হাজীপুর গ্রামের কনাই মিয়া, পারভেজ মিয়া, জলাল মিয়া, ফয়জু মিয়া, ইন্তাজ মিয়া, ইন্তু মিয়া, মতলিব মিয়া, মন্তাজ আলী, রেনু মিয়া, লতিফ মিয়া ও বাতির মিয়া বলেন, মনু নদীর ভাঙ্গনে আমাদের ঘরবাড়ি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছি।
এদিকে বুধবার মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে সৃষ্ট ভাঙনের খবর পেয়ে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মহি উদ্দিন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহ মুহাম্মদ জহরুল হোসেন, কৃষি অফিসার মো: জসিম উদ্দিন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. শিমুল আলী সরেজমিন ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শণ করেন। এছাড়া ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন করে দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেন কালের কণ্ঠের কুলাউড়া প্রতিনিধি ও বসুন্ধরা শুভসংঘের উপদেষ্টা মাহফুজ শাকিল, সাধারণ সম্পাদক মহি উদ্দিন রিপন, সদস্য ইব্রাহিম আলী, ময়জুল ইসলাম।
টিলাগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: আব্দুল মালিক বলেন, গত দুইদিনে আমার ইউনিয়নের তিনটি স্থানে মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে কয়েক শতাধিক পরিবার পানিবন্দি রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সংখ্যা এখনো সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা মিলেছে। উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।