কর্মধায় নব্য জঙ্গি সংগঠন ‘ইমাম মাহমুদের কাফেলায় অভিযান, নারীসহ ১০ জঙ্গি গ্রেপ্তার
বার্তালোক ডট কম
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ আগস্ট ২০২৩, ৭:৫৬ মিনিট
স্টাফ রিপোর্টারঃ মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার উপজেলার সীমান্তবর্তী গহীন অরণ্যে ‘ইমাম মাহমুদের কাফেলা’ নামে নতুন সংগঠনের আস্তানা থেকে সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ে উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের পূর্ব টাট্টিউলির জুগিটিলা গ্রামে শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ওই এলাকায় একটি টিলায় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম ও সোয়াট এবং পুলিশের যৌথ অভিযান চালিয়ে নারীসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের সাথে থাকা তিন শিশু সন্তানকেও উদ্ধার করা হয়।
সরেজমিনে ঘটনাস্থল গিয়ে স্থানীয় ও অভিযানে থাকা সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে জানা যায়, প্রায় দেড় মাস আগে কুলাউড়ার কর্মধার পূর্ব টাট্টিউলী গ্রামের বাসিন্দা ও কাতার প্রবাসী রাশিদ মিয়ার মালিকানাধীন ৫০ শতকের টিলা ভূমি ক্রয় করে জঙ্গী সংগঠনের সদস্যরা। এটি ক্রয়ে স্থানীয় হারুন মিয়া ও রাশিদের ভাই রফিক মিয়া তাদের সহযোগিতা করেন। ওই টিলায় তিনটি টিনের ঘর তৈরী করে বসবাস শুরু করে শিশু-নারীসহ ১৫/১৬ জন সদস্যের পরিবার। প্রয়োজন ছাড়া ওই টিলা থেকে নামতোনা তারা। তাদের চলাফেরা নিয়ে স্থানীয়দের সন্দেহ হলে নদী গর্ভে নিজেদের বাড়ি বিলীন হয়ে যাওয়ায় এখানে এসে ভূমি ক্রয় করেছে ও তারা সেখানে সবজি চাষ সামাজিক বনায়ন করবে বলে জানায়। এদিকে সপ্তাহ খানেক আগে সংগঠনের এক সদস্য তার পরিবারকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য ঢাকায় গেলে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাকে আটক করে সিটিটিসির সদস্যরা। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে কুলাউড়ার জুগিটিলায় তাদের নতুন আস্তানার কথা স্বীকার করে। সেই সুত্র ধরে সিটিটিসির সদস্যরা ওই এলাকায় প্রায় সাতদিন সেখানে অবস্থানরত সংগঠনের সদস্যদের নজরদারীতে রাখেন। নিশ্চিত হওয়ার পর শুক্রবার রাতে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ও সোয়াট
এবং পুলিশ ওই টিলাটি ঘিরে রাখে। সকাল ৬ টা থেকে প্রায় ৪ ঘণ্টাব্যাপী কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত কমিশনার আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর থানার মাইজবাড়ী গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে রাফিউল ইসলাম (২২), কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা থানার কালনা গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে হাফিজ উল্লাহ (২৫), নারায়নগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার রসুলপুর গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে খায়রুল ইসলাম (২২), তার স্ত্রী মেঘনা (১৭) এবং তাদের ১২ মাসের শিশু আবিদা। সাতক্ষীরা থানা ও জেলার দক্ষিণ নলতা গ্রামের ওমর আলীর পুত্র শরিফুল ইসলাম (৪০), পাবনা জেলার আটঘরিয়া থানার শ্রীপুর গ্রামের আব্দুছ ছত্তারের স্ত্রী শাপলা বেগম (২২) ও তার ১৮ মাসের শিশু কন্যা জুবেদা ও হুজাইফা (০৬), নাটোর জেলা ও সদর থানার চাদপুর গ্রামের সোহেল তানজীমের স্ত্রী মাইশা ইসলাম (২০), বগুড়া জেলার শরিয়াকান্দি থানার নিজবলাই গ্রামের সুমন মিয়ার স্ত্রী সানজিদা খাতুন (১৮), সাতক্ষীরা জেলার তালা থানার দক্ষিণ নলতা গ্রামের শফিকুল ইসলামের স্ত্রী আমিনা বেগম (৪০) এবং তার মেয়ে হাবিবা বিনতে শফিকুল (২০)।
আটককৃতদের কাছ থেকে ৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা ও স্বর্ণালংকার, ৫০টি ডেটোনেটর, তিন কেজি বিস্ফোরক, প্রশিক্ষণ সামগ্রী ও বিপুল পরিমান বিপুল জিহাদী বই উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশী হেফাজতে নেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে নগদ ৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা, বোমা তৈরীর বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন সামগ্রী ও জিহাদী বই উদ্ধার করা হয়।
পরে পার্শ্ববর্তী আছকরাবাদ খেলার মাঠে উদ্ধার করে বোম ডিসপোসাল ইউনিটের সদস্যরা বিষ্ফোরণের মাধ্যমে সেগুলো নিষ্ক্রিয় করেন। ওই টিলাতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের তৈরী চারটি ঘরে বিপুল পরিমাণ চাল, সয়াবিন তেলসহ খাদ্যদ্রব্য, চিকিৎসা সামগ্রী মজুদ করে রাখা হয়েছে। তাছাড়া তাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন গৃহসামগ্রী রয়েছে।
সিটিটিসির অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এই সংগঠনের প্রধান যে ব্যক্তি তার নাম পরিচয় পেয়েছি। এ মুহূর্তে তার নাম পরিচয় বলতে পারবোনা। তাঁকে গ্রেপ্তারে আমাদের বাহিনী কাজ করছে। তিনি আরো বলেন, বিনা বলপ্রয়োগে আমরা তাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। এরা নতুনভাবে জঙ্গী সংগঠনের সদস্য সংগ্রহ করেছে। তাদের কার্যক্রম যাতে নির্বিঘেœ চালিয়ে যেতে পারে সেজন্য এরকম নির্জন গহীন পাহাড়ী এলাকায় আস্তানা গড়ে। তারা যে জমি কিনেছে সেটি ৫০ শতক। তাদের কাছ থেকে দলিলটি উদ্ধার করেছি। তবে জমির দাম যেটি দলিলে লেখা সেটি সঠিক কিনা ও কি পরিমাণ অর্থ এখানে ব্যয় হয়েছে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্ত করে জানতে পারবো।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন অভিযানে নেতৃত্ব দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিটি-কাউন্টার টেরোরিজম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ) সহকারী কমিশনার শফিকুল ইসলাম। অভিযানে অংশ নেন সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার কামরুজ্জামান, ডেপুটি কমিশনার নাজমুল হক, সোয়াট কমান্ডার এডিসি জাহিদুল ইসলাম, মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সুপার মনজুর রহমান পিপিএম (বার), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মোহসিন, কুলাউড়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দীপঙ্কর ঘোষ, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুছ ছালেক। এদিকে খবর পেয়ে দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ড. উর্মি বিনতে সালাম, কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুর রহমান খোন্দকার ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মেহেদী হাসান।
কুলাউড়া থানার ওসি মো. আব্দুছ ছালেক বলেন, আটককৃতদের ঢাকায় নেওয়া হচ্ছে। সেখানে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদেরকে আদালতে নেওয়া হবে।




