মানুষ আমাদের পর ভাবেনি, সবসময় বুক উজাড় করে সম্মান দিয়েছে মৌলভীবাজারে
বার্তালোক ডট কম
প্রকাশিত হয়েছে : ০৬ জুন ২০২৬, ১২:০১ মিনিট
অনলাইন ডেস্ক : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য নাম প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে যার অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন মানুষ। সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার,পারিবারিক মূল্যবোধ, ঈদের স্মৃতি এবং সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে এক আবেগঘন আড্ডায় অংশ নেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এম নাসের রহমান এবং তাঁর সহধর্মিণী, মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি রেজিনা নাসের।
তাসনোভার বিশেষ ঈদ আয়োজনে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে উঠে আসে একটি রাজনৈতিক পরিবারের অন্দরমহলের নানা অজানা গল্প, সংগ্রামের স্মৃতি, মানুষের ভালোবাসা এবং আগামী দিনের বাংলাদেশ নিয়ে তাদের স্বপ্নের কথা।
বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে এম নাসের রহমান বলেন, “বাবার একটা ছায়া সবসময়ই আমাদের ওপর লেগে থাকে। অর্থমন্ত্রীর সন্তান হওয়ার কারণে স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মানুষের কাছ থেকে বাড়তি সম্মান ও ভালোবাসা পেয়েছি। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর সততা, দেশপ্রেম এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। দেশের ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি মানুষের হৃদয়ে যে স্থান করে নিয়েছেন, তা সত্যিই অতুলনীয়।
তিনি জানান, ১৯৯৫ সাল থেকেই এলাকার মানুষের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ শুরু হয়। বাবার কোনো চাপ ছিল না, বরং স্থানীয় নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আগ্রহেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
“২০০০ সালের নির্বাচনসহ বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের সময় রাজনৈতিক মামলা, হয়রানি এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েও পথ চলতে হয়েছে। কিন্তু মৌলভীবাজারের মানুষের ভালোবাসাই সবসময় আমাকে সাহস দিয়েছে,” বলেন তিনি।
স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রেজিনা নাসের বলেন, “ওয়ান-ইলেভেনের সময় চারদিকে এক ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ ছিল। গভীর রাতে কুয়াশার মধ্যে একা গাড়ি চালিয়ে ঢাকা থেকে কাশিমপুর কারাগারে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে গেছি। সন্তানদের দেখভাল, সংসার সামলানো এবং নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমে নারীদের সংগঠিত করা—সবই একসঙ্গে করতে হয়েছে।”l
তিনি বলেন, “মৌলভীবাজারের মানুষ আমাদের পর ভাবেনি, সবসময় বুক উজাড় করে সম্মান দিয়েছে। তাদের সেই ভালোবাসা ও আন্তরিকতার কারণেই কোনো প্রতিকূলতাকে কঠিন মনে হয়নি।
রেজিনা নাসের আরও বলেন, রাজনীতির কারণে তাঁদের পরিবারকে নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হলেও সাধারণ মানুষের ভালোবাসা সবসময় তাঁদের শক্তি জুগিয়েছে।
ঈদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, বিয়ের পর দীর্ঘদিন হংকংয়ে বসবাস করলেও প্রতি বছরই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে তাঁরা মৌলভীবাজারে ছুটে আসতেন। করোনা মহামারির সময় ছাড়া এম নাসের রহমান কখনো ঢাকায় কোরবানি করেননি; সবসময় এলাকার মানুষকে সঙ্গে নিয়েই ঈদ উদযাপন করেছেন।
রেজিনা নাসের বলেন, “আমার শাশুড়ির একটি অসাধারণ গুণ ছিল। তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে মৌলভীবাজারে ঈদ করতে ভালোবাসতেন। সেই পারিবারিক ঐতিহ্য এখনো আমরা ধরে রেখেছি। আমাদের সন্তানরাও গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা ও মানুষের সঙ্গে মিশে থাকার শিক্ষা পরিবার থেকেই পেয়েছে।
পারিবারিক নানা স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে তিনি হাসতে হাসতে বলেন, “বিয়ের পর থেকে ইফতারে পেঁয়াজু, বেগুনি আর বুট আমি নিজে না বানালে পরিবারের সদস্যদের যেন চলতই না।
অন্যদিকে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ও তাঁর সহধর্মিণীর লাল গরুর প্রতি বিশেষ পছন্দ ছিল। তাই কোরবানির ঈদ এলেই গ্রামের হাট থেকে লাল গরু কেনা ছিল পরিবারের এক দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।
পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্নের জবাবে রেজিনা নাসের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তাঁদের মেজো মেয়েকে নিয়ে। তিনি বলেন, “আমার মেজো মেয়ের মধ্যে ওর দাদা এম সাইফুর রহমানের মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের গুণ রয়েছে। আমেরিকা থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পরে লন্ডন বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ করার পরও সে মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসে।
তিনি বলেন, “গত নির্বাচনে সে যেভাবে গ্রামে গ্রামে, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করেছে, তা দেখে এলাকার মানুষ মুগ্ধ হয়েছে। এখন অনেক সময় এলাকার মানুষ আমার চেয়েও ওর খোঁজ বেশি করে। ভবিষ্যতে আমাদের পরিবারের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ধরে রাখার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি ওর মধ্যেই দেখি।
রাজনীতিতে সৌজন্য ও সহনশীলতার সংস্কৃতির ওপর গুরুত্বারোপ করে এই দম্পতি বলেন, মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। এখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সামাজিক সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য বজায় রাখার ঐতিহ্য রয়েছে।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে এম নাসের রহমান বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত হবে। রাজনীতি থেকে হানাহানি, প্রতিহিংসা ও বিভাজন দূর হবে। একটি সুন্দর, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশই আমাদের স্বপ্ন।
প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের সততা, দেশপ্রেম এবং জনকল্যাণমুখী রাজনীতির উত্তরাধিকারকে ধারণ করে আগামী প্রজন্ম দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে—ঈদের বিশেষ এই আয়োজনে এমন আশাবাদই ব্যক্ত করেছেন এম নাসের রহমান ও রেজিনা নাসের।



