পুরুষশূন্য গ্রামে মহিলাদের রাত কাটে পুলিশ আতঙ্কে
বার্তালোক ডট কম
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১:৩৩ মিনিটকুলাউড়া প্রতিনিধি : কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে গত ০৪ ফেব্রুয়ারি ভোর রাতে চোর সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে সোনাম (৩৫) নামক এক যুবক চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন মারা যায়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী ৫ জনের নামোল্লেখ করে এবং ৩০-৩৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করে মামলা দায়ের করে। ঘটনার পর থেকে ভবানীপুর গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। মহিলা ও শিশুরা রাতে থাকেন পুলিশ আতঙ্কে। আসামী গ্রেফতার অভিযানের নামে এলাকায় পুলিশী হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিন ভাটেরা ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে গেলে দেখা যায়, পুরো গ্রামে সুনসান নিরবতা। ছোট শিশুরা খেলা করলেও অপরিচিত মানুষ দেখলেই পুলিশ মনে করে ভয়ে পালিয়ে যায়। ৯০ উর্ধ্বো এক বৃদ্ধ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কিশোর কিংবা কোন পুরুষ মানুষ গ্রামে নেই। সবাই ভয়ে আছেন- যদি পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। হত্যা মামলা জেল থেকে বের হওয়া মুশকিল হবে তাই তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
বৃদ্ধ জানান, ভবানীপুর গ্রামের মসজিদের মাইকসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়েছে ২ বার। এছাড়া বাড়িতে বাড়িতে চুরির ঘটনায় তারা অতিষ্ঠ। প্রবাস ফেরৎ লোকমান হোসেন তাই নিজের বাড়িতে লাগিয়েছেন সিসিটিভি।
সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল কাইয়ুমের ভাই লোকমান হোসেনের স্ত্রী ও মেয়েরা জানান, ঘটনার দিন রাতে চোর সোনাম তাদের বাড়িতে এসে ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা চুরির চেষ্ঠা চালায়। এসময় বাড়ির লোকজন চোর চোর বলে চিৎকার দিলে এলাকার লোকজন এসে তাকে ধাওয়া করে। দৌঁড়ে পালাবার সময় একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলে এলাকাবাসী তাকে আটক করতে সক্ষম হন। আটক চোর সোনামকে সাবেক মেম্বার আব্দুল কাইয়ুমের উঠানে উত্তম মধ্যম দিয়ে বর্তমান মেম্বার মখলিছুর রহমানের মাধ্যমে টহল পুলিশের এসআই আলমগীর মিয়ার নিকট সোপর্দ করা হয়।
এদিকে সোনাম ঘটনার পরদিন ৫ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিলেট ওসমানী হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে। এ ঘটনায় পুলিশের এসআই মো. আলমগীর মিয়া বাদি হয়ে সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল কাইয়ুম (৫০) সহ পাঁচ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৩০-৩৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার আসামী করা হয়েছে আব্দুল কাইয়ুমের ভাই লোকমান হোসেন (৫৫), টিলাগাঁও ইউনিয়নের মোবারকপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত আব্দুল গণির ছেলে জাহির মিয়া (২৩), দেওকাপনের বাসিন্দা মৃত মছকিন মিয়ার ছেলে ইজাজুল আহমেদ (২০), দক্ষিণবাগের বাসিন্দা মৃত আছদ্দর আলীর ছেলে আনসার মিয়া (৪৮)। ওইদিন রাতেই পুলিশ সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল কাইয়ুম, দক্ষিণভাগ গ্রামের সুজন মিয়া (৪৬), একই এলাকার আনসার মিয়া (৪৬), ভবানীপুর গ্রামের আসুক মিয়া (৩৭) কে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে প্ররণ করে। এরপর থেকেই যেন গোটা এলাকায় গ্রেফতার আতঙ্ক দেখা দেয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত হন এসআই মোঃ নাজমুল হাসান। এলাকাবাসীর অভিযোগ রাতে তিনি ২০-২৫ পুলিশ নিয়ে এলাকায় তল্লাশী চালান। তল্লাশীর নামে তিনি এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন।
মহিলারা জানান, পুলিশ কর্মকর্তা ধমক দিয়ে মহিলাদের ধরে নিতে এসেছেন বলেন। আসামীদের ধরে না দিলে মহিলাদের নিয়ে যাবেন। এমন পরিস্থিতিতে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় খোঁজে পাচ্ছেন না তারা।
স্থানীয় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ মখলিছুর রহমান বলেন, চোর সন্দেহে ওই যুবককে এলাকার লোক যখন চোর চোর বলে দৌঁড়াতে থাকেন তখন ওই যুবক একটি গাছের সাথে ধাক্কা খায়। এরপর স্থানীয় লোকজন চোর সন্দেহে তাকে মারধর করে সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল কাইয়ুমের বাড়িতে নিয়ে আসেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই যুবককে আমরা পুলিশের এসআই আলমগীরের কাছে হস্তান্তর করি। এখন স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, অজ্ঞাতনামা আসামীদের ধরতে গিয়ে নাকি পুলিশ অনেকের বাড়িতে হয়রানি করছে। কোন নিরপরাধ মানুষ যাতে হুয়রানি না হয় সেজন্য পুলিশের কাছে অনুরোধ করছি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোঃ নাজমুল হাসান মুঠোফোনে জানান, হত্যাকান্ডের বিষয়টি তদন্তাধীন আছে। এখানে হয়রানি করার কোন প্রশ্নই আসেনা। মহিলারা অহেতুক মিথ্যা অভিযোগ করছেন।
কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আব্দুছ ছালেক জানান, আসামী আটকে অভিযানে গেলে রাতে বিভিন্ন বাড়িতে তল্লাশী চালাতেই পারে। তবে নারী ও শিশুদের যাতে হয়রানি করা না হয় বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।#




