হাকালুকি হাওরে জলচর পাখির সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে
বার্তালোক ডট কম
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ৬:৫০ মিনিটমাহফুজ শাকিল : মিঠা পানির জলাভূমি ন্যামে খ্যাত এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওরে গত দুই বছরের তুলনায় এবছর জলচর (দেশী ও পরিযায়ী) পাখির সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে পাখির সংখ্যা অতীতের কয়েক বছরের তুলনায় অনেক কম। হাওরের ৪৩টি বিলে পাখি শুমারির পর শুক্রবার বিকেলে শুমারিতে নেতৃত্বদানকারী দেশের খ্যাতিমান পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক এসব তথ্য কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন।
গত ২৮ ও ২৯ জানুয়ারি হাকালুকি হাওরের বিভিন্ন বিলে এ পাখি শুমারি করা হয়। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হকের নেতৃত্বে শুমারিতে অংশ নেন পল তমসন, সমীর সাহা, মাহি ওয়াসিম, আহমেদ রাতুল ও শফিকুর রহমান। পাখি শুমারিতে উপস্থিত ছিলেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের (মৌলভীবাজার) বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী।
সরকারের বনবিভাগের সুফল প্রকল্পের অর্থায়নে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠান (আইইউসিএন) ও বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব (বিবিসি) যৌথ উদ্যোগে এবারের শুমারির আয়োজন করে।
শুমারি দল সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার প্রায় ২৮ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে হাকালুকি হাওরটি বিস্তৃত। এটি দেশের বৃহত্তম হাওর। চলতি বছরের ২৮ ও ২৯ জানুয়ারি সকাল থেকে ৬ সদস্যের দুটি দল বিভক্ত হয়ে হাওরের ছোট-বড় ৪৩টি বিলে শুমারি কাজ শুরু করেন, যা বিকেল পর্যন্ত চলে।
এদিকে পাখি শুমারি চলাকালে হাওরের কালাপানি বিল এলাকায় আতর আলী (৫৬) নামে এক পাখি শিকারীকে ৪০টি আবাবিল পাখিসহ হাতেনাতে আটক করা হয়। ১টি পাখি মারা গেলেও ৩৯টি পাখি হাওরে ছেড়ে দেয়া হয়। আতর আলী ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া ইউনিয়নের আশিঘর এলাকার বাসিন্দা আইয়ুব আলীর ছেলে। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জিম্মায় তাকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় এবং বন্যপ্রাণী আইনে মৌলভীবাজার আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক এই প্রতিবেদককে মুঠোফোনে বলেন, শুমারিতে ৫২ প্রজাতির ৩৭ হাজার ৭৭৮ জলচর পাখির দেখা মিলেছে। এর মধ্যে হাওরের হাওরখাল বিলে সর্বোচ্চ সংখ্যক ১২ হাজার ৭৩২টি পাখি দেখা গেছে। এছাড়া বেশি দেখা মিলেছে পিয়াং হাঁসের। এর সংখ্যা ৫ হাজার ৪৫৭টি। এরপর ছোট পানকৌড়ির সংখ্যা ৪ হাজার ৫৩৭টি। এদিকে শুমারির সময় হাকালুকির দুটি বিলে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির দুটি ফুলুরি হাঁসের দেখা মিলেছে। এর আগে ২০২২ সালে শুমারিতে হাওরে ৫১ প্রজাতির ৩৬ হাজার ৫০১টি জলচর পাখির দেখা মিলেছিল। এ ছাড়া ২০২১ সালে ৪৫ প্রজাতির মোট ২৪ হাজার ৫৫১টি, ২০২০ সালে ৫৩ প্রজাতির ৪০ হাজার ১২৬টি, ২০১৯ সালে ৫১ প্রজাতির ৩৭ হাজার ৯৩১টি, ২০১৮ সালে ৪৪ প্রজাতির ৪৫ হাজার ১০০টি এবং ২০১৭ সালে ৫০ প্রজাতির ৫৮ হাজার ২৮১টি পাখির দেখা মিলেছিল।
বর্তমানে দেখা যায়, মানুষ না বুঝে বিভিন্ন ধরণের পাখি শিকার করছে আর সেই পাখি খাচ্ছে যার কারণে মানুষ সহজেই স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরতে পারে। তাই সকলকে পাখি শিকার থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম এসিস্ট্যান্ট সমীর সাহা।
কয়েক বছর ধরে পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়ে পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, শুধু হাকালুকি হাওরে নয়, কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব দেশেই পাখির সংখ্যা কমে আসছে। এর মূল দুটি কারণ হলো পাখির আবাসস্থল কমে যাওয়া ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পাখির আবাসস্থল কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আর বৈশ্বিক উষ্ণতা পাখির জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ছে। এ পরিস্থিতি ঠেকাতে হলে পাখিদের আবাসস্থল রক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
ইনাম আল হক যোগ করে আরও বলেন, হাকালুকি হাওরে সাধারণত শীত মৌসুমে দুর্বৃত্তরা বিষটোপ ও জাল দিয়ে ফাঁদ তৈরি করে পাখি নিধন করে। বিষটোপের কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি পাখি মারা যায়। পাখিরা তাদের জীবন বিপন্ন মনে করলে আর ওই হাওরে ভিড় করে না। যা তাদের কষ্টের মূল কারণ। এ কারণেও হাওরে পাখি কমে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, পাখি শিকারিদের অবাধ নিধনযজ্ঞে হাওরে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি চরম হুমকির মুখে আছে। পাখির সংখ্যা বাড়াতে হলে বা পাখি রক্ষা করতে হলে বিষটোপে শিকার বন্ধে আইনের পাশাপাশি নিরাপদ অভয়াশ্রম তৈরি করে তা সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের (মৌলভীবাজার) বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় পাখি শিকার বন্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা চালিয়ে যাচ্ছি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করছি। এছাড়া মানুষদের সচেতন করার জন্য গত জানুয়ারি মাসে দুটি সচেতনতামূলক সভা করেছি। সভায় মানুষদের পাখি নিধন না করার জন্য এবং বন্যপ্রাণী আইনে যে শাস্তির বিধান রয়েছে সেটা নিয়েও আলোচনা করছি। তিনি হতাশা ব্যক্ত করে আরো বলেন, পাখি শিকার করে সমাজের দরিদ্র লোক আর সেই পাখি ভোগ করছে সমাজের এক শ্রেণীর ভদ্র লোক। মোটকথা হলো, পাখি শিকার বন্ধে এবং পাখির নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে দিতে সমাজের সকল শ্রেণীপেশার মানুষদের সচেতন হয়ে পাখি প্রেমে এগিয়ে আসতে হবে।
হাকালুকি হাওরটি কোন উন্নয়ন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় অরক্ষিত হাওরে বিষটোপ আর ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করায় দিন দিন অতিথি পাখির সমাগম কমছে। মৎস্য অভয়াশ্রম থাকলেও সেই অভয়াশ্রমগুলোতে শিকারিরা হানা দেয়। শীতকালে এসব বিলকে ঘিরে পরিযায়ী পাখিদের বিচরণে মুখরিত হয়ে উঠতো গোটা হাওরাঞ্চল। হাওরের ইকো সিস্টেম রক্ষায় অবিলম্বে হাওরকে উন্নয়ন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি হাওর তীরের মানুষের। ১৯৯৯ সালে সরকার এ হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া বা ইসিএ) ঘোষণা করে।




