সিজোফ্রেনিয়াকে জয় করে ২০ বছর পর এমবিবিএস পাস করলেন জুড়ীর জামাল
বার্তালোক ডট কম
প্রকাশিত হয়েছে : ১৭ মার্চ ২০২৩, ১০:০৬ মিনিটজুড়ী প্রতিনিধি : এমবিবিএস কোর্সের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আগে মানসিক রোগে (সিজোফ্রেনিয়ায়) আক্রান্ত হন মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার কামিনীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম জামাল। একপর্যায়ে তিনি লেখাপড়া থেকে ছিটকে পড়েন। দীর্ঘদিন চিকিৎসা করানোর পর তিনি সুস্থ হয়ে উঠেন। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তিনি আবার মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। মধ্যখানে কেটে যায় প্রায় ২০ বছর। তবে তিনি একবারে দমে যাননি। এমবিবিএস চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি কৃতিত্বের সহিত পাশ করেন। আজ বৃহস্পতিবার থেকে তিনি শিক্ষানবিশ চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেছেন।
আব্দুল করিম জামালের বাবা মৃত আব্দুল মতিন জুড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। মা জাহানারা বেগমও বেঁচে নেই। তাঁরা সাত ভাই ও চার বোন। জামাল বিবাহিত। সংসারে স্ত্রী ও সাড়ে চার বছরের একটা কন্যা সন্তান রয়েছে। এবারের মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় তাঁর বড় বোনের মেয়ে নোয়াখালীর আব্দুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন।
আব্দুল করিম জামাল বলেন, তিনি চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। তিনি ১৯৯২ সালে উপজেলার জুড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ১৯৯৪ সালে ঢাকার তেজগাঁও কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৯৪-৯৫ শিক্ষাবর্ষে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান। ২০০১ সালে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আগে তাঁর মানসিক রোগ দেখা দেয়। কোনোভাবেই তিনি লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে তাঁর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে তাকে চিকিৎসা করানো হয়। চিকিৎসকেরা জানান, তিনি সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। তিনি আরো বলেন, চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির কারণে একপর্যায়ে মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁর ভর্তি বাতিল করে দেয়। সুস্থ হওয়ার পর তিনি আবার লেখাপড়ায় মনযোগ দেন। ভর্তির জন্য মেডিকেল কলেজে যান। শিক্ষকদের সঙ্গে বিস্তর কথা বলেন। ছাত্রত্ব ফিরে পেতে বিভিন্ন দপ্তরে দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে হয় তাঁকে। পরে শিক্ষকদের একটি বোর্ড বসে তাঁকে ভর্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে তিনি এমবিবিএসের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেন। ৪ মার্চ পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়।
এক প্রতিক্রিয়ায় জামাল বলেন, ‘পাস করবো এটা শতভাগ বিশ্বাস ছিল। পরীক্ষার ফলাফল দেখে অনেকটা আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। লেখাপড়া বন্ধের প্রায় ২০ বছর পর ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে পাস করলাম। বন্ধু, স্বজন, শিক্ষক সবাই সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। চিকিৎসক হয়ে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করতে চাই।
আব্দুল করিম জামালের সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাঈদ এনাম বর্তমানে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। জামাল অসুস্থ হওয়ার পর প্রায় ছয় বছর তিনি তাঁর চিকিৎসা করেন। সাঈদ এনাম বলেন, ‘বিষণœতা অথবা মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবহেলা করা ঠিক নয়। বরং সঠিক চিকিৎসায় তাঁরা সেরে উঠতে পারেন। জামাল এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’ দীর্ঘ চিকিৎসায় সিজোফ্রেনিয়াকে জয় করে জামালের এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের বিষয়টি আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন তাদের ওয়েব পেজে তুলে ধরেছে। তারা জামালকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে।




