এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওরে বেড়েছে পাখির সংখ্যা
বার্তালোক ডট কম
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ মার্চ ২০২৬, ১১:১৪ মিনিট

কুলাউড়া প্রতিনিধি : ৫৪ হাজারের বেশি জলচর পাখি দেখা মিলেছে
প্রথমবারের মতো রাজহাঁস দেখা গেছে ১৯৪টি
হাকালুকি হাওরে বেড়েছে পাখির সংখ্যা সম্প্রতি হাকালুকি হাওরের ৪৩টি বিলে পাখিশুমারি চালানো হয়।
এশিয়ার বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি খ্যাত হাকালুকি হাওরে এবার জলচর পাখির সংখ্যা গত বছরের তুলনায় বেশি দেখা গেছে। অন্য বছরের মতো হাওরে বিষটোপ ও নিষিদ্ধ জালে আটকে মারা যাওয়া পাখির দেখা তেমন মেলেনি।
শনিবার (৭ মার্চ) বিকেলে এসব তথ্য জানান বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা, খ্যাতনামা পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক। বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হকের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি হাকালুকি হাওরের ৪৩টি বিলে পাখিশুমারি চালায়।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও আইইউসিএন এ শুমারির আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করেছে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সিলেট।
শুমারিতে অংশ নেওয়া অন্য সদস্যরা হলেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম, বার্ড ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার আলম দীপু, সহ-সভাপতি জেনিফার আজমেরি, সদস্য অণু তারেক প্রমুখ।
বার্ড ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার আলম দীপু বলেন, এবার হাকালুকি হাওরে ৫৩ প্রজাতির মোট ৫৪ হাজার ৪৮৬টি জলচর পাখি পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে ১৮টি স্থানীয় ও ৩৫টি পরিযায়ী প্রজাতির। গত বছর শুমারিতে হাওরটিতে ৬০ প্রজাতির মোট ৩৫ হাজার ২৬৮টি পাখি পাওয়া গিয়েছিল। সেই হিসাবে এবার পাখির সংখ্যা বেড়েছে। এবার হাওরের চিনাউরা, হাওরখালসহ আরও কয়েকটি বিলের পরিবেশ তুলনামূলক ভালো ছিল, পানি বেশি ছিল।
অন্য হাওরে পানি কমে যাওয়ায় এগুলোয় পাখিগুলো চলে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গতবছর শুমারিকালে হাওরের নাগুয়া-লরিবাই বিলে পাখি শিকারের জন্য প্রায় ১০০ মিটার লম্বা নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল পাওয়া গিয়েছিল। সেই জালে আটকে মৃত দুটি টিমেঙ্কের চাপাখি মিলেছিল। পরে শুমারি দলের সদস্যরা জাল পুড়িয়ে তা ধ্বংস করেন। পিংলা বিলের পাশে ‘কার্বোটাফ’ নামের একধরনের রাসায়নিক কীটনাশকের প্যাকেটও পাওয়া যায়।
ধানের সঙ্গে ওই কীটনাশক মিশিয়ে বিলের আশপাশে ছিটিয়ে রাখা হয়। পাখিরা খাবার ভেবে তা খেয়ে মারা যেত।
এবার হাওরে সেই চিত্র দেখা যায়নি বলে দাবি করেছেন বার্ড ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার আলম দীপু। তিনি বলেন, আগে প্রায় প্রতিবছরই হাকালুকি হাওরে অর্ধ শতাধিক মৃত পাখি মিলত। কিন্তু এবার মেলেনি। জনসচেতনতা ও সংশ্লিষ্ট বিল ব্যবস্থাপনায় থাকা প্রতিষ্ঠানের লোকজনের নজরদারির কারণে শিকারিদের অপতৎপরতা বন্ধ হতে পারে।
বার্ড ক্লাব সূত্রে জানা যায়, এবার হাকালুকি হাওরে একটি খুবই বিরল প্রজাতির সাদা কপাল রাজহাঁসের দেখা মিলেছে, যা সারা দেশে ১০ থেকে ১২ বছরে একবার দেখা যেত। এছাড়া হাওরে এবার প্রথমবারের মতো ১৯৪টি রাজহাঁসের দেখা মিলেছে, যা হাওরে আগে দেখা যেত না। হাওরে রাজহাঁস পাওয়া খুবই বিরল বাংলাদেশের জন্য। বিগত কয়েক বছর ধরে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ধীরে ধীরে আসা শুরু করছে রাজহাঁস। উপকূলের সমুদ্রের পাড়ে যেসব পাখি থাকতো সেসব প্রজাতির সৈকত (লালপা, গুলিন্দা, জৌরালি) পাখির দেখা মিলেছে অনেক বেশি। এর মধ্যে জৌরালি পাখি সাড়ে তিন হাজারসহ সব সৈকত পাখি মিলে সংখ্যা সাত হাজারের বেশি।
সূত্র জানায়, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকাজুড়ে হাকালুকি হাওর বিস্তৃত। এর আয়তন প্রায় ২৮ হাজার হেক্টর। ১৯৯৯ সালে সরকার হাকালুকি হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া) ঘোষণা করে। হাওরে ছোট-বড় মিলে ২৩৮টি বিল রয়েছে।
বার্ড ক্লাব ও আইইউসিএন’র পর্যবেক্ষণ বলছে, গত ২০ বছরে সারা দেশে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমেছে ৩৫ শতাংশ। হাকালুকিতে কমেছে ৪৫ শতাংশ। ২০০০ সালের আগে হাওরে বিচরণ করতো ৭৫ থেকে ৮০ হাজার পাখি। এর ৮০ শতাংশই হাকালুকি হাওরে ছিল। ২০২৪ সালে হাকালুকি হাওরে পাখি শুমারি হয়নি। এর আগে ২০২৩ সালের শুমারিতে সেখানে ৫২ প্রজাতির ৩৭ হাজার ৭৭৮টি, ২০২২ সালে ৫১ প্রজাতির ৩৬ হাজার ৫০১টি, ২০২১ সালে ৪৫ প্রজাতির ২৪ হাজার ৫৫১টি, ২০২০ সালে ৫৩ প্রজাতির ৪০ হাজার ১২৬টি, ২০১৯ সালে ৫১ প্রজাতির ৩৭ হাজার ৯৩১টি, ২০১৮ সালে ৪৪ প্রজাতির ৪৫ হাজার ১০০টি এবং ২০১৭ সালে ৫০ প্রজাতির ৫৮ হাজার ২৮১টি জলচর পাখির দেখা মিলেছিল।
হাওর অঞ্চলে পাখির সংখ্যা কমে যাওয়া ও মাছের উৎপাদন বাড়ানোর কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়ে পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, হাওরে পাখির সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। শুধু হাকালুকি হাওরে নয়, কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব দেশেই পাখির সংখ্যা কমে আসছে। এর মূল দুটি কারণ হলো পাখির আবাসস্থল কমে যাওয়া ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পাখির আবাসস্থল কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আর বৈশ্বিক উষ্ণতা পাখির জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ছে। এ পরিস্থিতি ঠেকাতে হলে পাখিদের আবাসস্থল রক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
ইনাম আল হক আরো বলেন, শীতকালে পাখি পরিযায়ী হয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে খাবারের সন্ধানে ছুঁটে আসে বাংলাদেশে। আশ্রয় হিসেবে বেছে নেয়ে হাকালুকি হাওরের মতো জলাশয়গুলোকে। হাওরে আগে মাছের উৎপাদন বাড়াতে হবে, অভয়াশ্রম তৈরি করে সেটির পরিবেশ ঠিক করতে হবে। তাহলে হাওরে পাখি আসবে। তিনি মনে করেন, হাওর অঞ্চলে কৃষকরা অবাধে ধানসহ অন্যান্য কৃষিকাজে কীটনাশক ব্যবহার করছেন যার প্রভাব পড়ছে হাওরেও। মাছের প্রধান খাবার ফড়িং। এখন হাওরে সেই ফড়িং দেখা মেলে না।
এ ছাড়া কীটনাশক ব্যবহার করার কারণে ফড়িংসহ সব ধরনের পোকামাকড় ধ্বংস হচ্ছে। কৃষকের জমির মাটির উর্বরতা বাড়ছে, ফলন হচ্ছে ঠিক কিন্তু বৃষ্টি হওয়ার পর সেই পানি হাওরে গিয়ে মিশছে। কৃষক হাওরে ধান একবছর ভালো পাচ্ছেন কিন্তু হাজার হাজার মণ মাছ নষ্ট হচ্ছে। এর দায়ভার কে নেবে? কীটনাশকের কারণে হাওরে মাছের প্রধান খাবার ফড়িংসহ পোকামাকড় মারা যাচ্ছে। তাই মাছও কমে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন ইনাম আল হক।
এই পাখি বিশেষজ্ঞের ভাষ্য, আমাদের মাছের জন্মস্থান হাওরকে রক্ষা করতে হবে। কারণ এই মাছ দেশের মানুষের চাহিদা মিটাচ্ছে। আমরা মাছের প্রজনন ক্ষতি করছি বোকামি বা অজ্ঞতার কারণে। প্রাকৃতিক মাছ এক দশমাংশ নেই। হাওরে অন্তত ২০-৩০টি বিলকে শীতকালের জন্য সুরক্ষিত রাখতে হবে সেখানে পাহারাদার বসিয়ে। যেখানে কোন মাছ ধরা যাবেনা। ওই সময় ওইসব বিলে মাছের প্রজনেনর সুযোগ দিতে হবে।
এ ছাড়া, হাওরে সচেতনতা ও পরিকল্পনার অভাবে আমাদের হাজার হাজার কোটি টাকার মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, আমরা কেউ এসব নিয়ে কথা বলি না। বিগত সময় হাকালুকি হাওরে সরকার ১২ থেকে ১৫টি বিলকে মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছিল। কিন্তু পাখি শুমারি চলাকালে বিলগুলো শুকনো রয়েছে। মাছের নিরাপদ অভয়াশ্রমের জন্য কোনো কাজ পরিকল্পনামতো করা হয়নি। কাগজে-কলমে সব ঠিক হয়তো রয়েছে। বিলগুলো খুঁড়ে পানি রাখা দরকার ছিল। হাকালুকির হাওরখাল বিলকে ১০ বছর আগে মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছিল সরকার। কিন্তু এই বিল এখনও কেন শুকনো থাকতে হবে। এসব বিষয় তদারকির দায়িত্ব সরকারের মৎস্য বিভাগের বলে মনে করেন ইনাম আল হক।
মৎস্য বিভাগের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে মৎস্য অভয়াশ্রম সঠিকভাবে গড়ে উঠছে হচ্ছে না। এজন্য এই কাজে সরকারের মৎস্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থেকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়বে এবং পাখির সংখ্যাও বাড়বে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন শনিবার বিকেলে বলেন, বিস্তীর্ণ হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। হাকালুকি হাওরের পরিবেশ যাতে বিনষ্ট না হয় সে বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। তিনি বলেন, হাকালুকির কুলাউড়া অংশে কাংলি বিল নামে একটি মাছের অভয়াশ্রম রয়েছে। সেটিতে এখন হয়তো দীর্ঘ খড়া থাকায় পানি কম। এছাড়া নতুন করে হাওরের মেদি বিলকে অভয়াশ্রম করার প্রস্তাবনা অনুমোদন হলে মৎস্য বিভাগ একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। হাওরের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় অবাধে কীটনাশক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।



